কমলকৃষ্ণ দে, পূর্ব বর্ধমান: দশটি নয় আঠারোটি হাতের অধিকারি দেবী সর্বমঙ্গলা। প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। রাজার পুজো তাই আজও চাঁদনীঘাট থেকে দেবীর ঘটের জল আনতে ব্যবহৃত হয় রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় পা মেলান আপামর বর্ধমানবাসী থেকে প্রশাসনিক আমলারা। প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা রাজ ঐতিহ্য ও রীতি মেনে প্রতিপদে রাঢ়বঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ঘটোত্তোলনের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ধমানে শুরু হল দুর্গাপুজো। পুজো চলবে ন’দিন ধরে।
রাজ আমলের রীতি মেনে মহালয়ার পরের দিনই অর্থাৎ প্রতিপদে ঘোড়ার গাড়ি করে, বাদ্যযন্ত্র সহকারে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে কৃষ্ণসায়র চাঁদনীঘাট থেকে রুপোর ঘটে করে জল নিয়ে এনে তা প্রতিষ্ঠা করা হল সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ঘট প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ধমানে শারদ উৎসবের ঢাকে কাঠি পরে। কার্যত এদিন থেকেই সূচনা হয়ে যায় দুর্গাপুজোর। এদিনের পদযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু,মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র সহ একাধিক মঠ ও মিশনের মঠাধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা। কথিত আছে,১৭০২ সালে স্বপ্নাদেশ পেয়ে বর্ধমানের মহারাজ কীর্তিচাঁদ চুনুরীদের কাছ থেকে দেবী সর্বমঙ্গলার বিগ্রহকে উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান মন্দিরে।দেবী বিগ্রহ কষ্টিপাথরের, অষ্টাদশভূজা,সিংহবাহিনী। প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মায়ের পুজোয় আজও সেই সাবেকি রাজকীয় ধারা অক্ষুণ্ণ।
চিরাচরিত প্রথা মেনে মহালয়ার পরে প্রতিপদে চাঁদনীঘাট থেকে দেবীর ঘটে জল ভরা হয়। ৯ দিন ধরে চলে মায়ের পুজো।নবমীর দিন নবকুমারী পুজোর মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুজো।এছাড়াও বছরের প্রতিদিনই নিয়ম মেনে দেবীর পুজা হয়, দেবীকে ভোগ নিবেদনও করা হয়। প্রতিপদ থেকে শুরু করে টানা নয় দিন ধরে চলবে চণ্ডীপাঠ ও বিশেষ আরাধনা। আগে সন্ধি পুজোয় সর্বমঙ্গলা মন্দিরে কামান দাগা হতো। সেই কামানের আওয়াজ শুনেই আশেপাশের এলাকার জমিদার বাড়িতে শুরু হত সন্ধিপুজো।পাশাপাশি চলত মহিষ, মেষ ও ছাগ বলি। ১৯৯৭ সালে একটি দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যায় কামান দাগার প্রথা, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্ধ হয়েছে বলি প্রথাও।কিন্তু ঐতিহ্য ও আন্তরিকতায় ভাঁটা পড়েনি এতটুকু।
আজও সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুজোকে ঘিরে আনন্দে মেতে উঠেন বর্ধমানবাসী। ঘট উত্তোলনের দিন সকাল থেকেই মহিলা-পুরুষ ছোট থেকে বড় বহু মানুষ নতুন পোশাকে হাজির হন সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে।