কমলকৃষ্ণ দে, বর্ধমান: পশ্চিমবঙ্গে কিছু জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো আজও নজর কাড়ে আপামর বিশ্বের মানুষের মনে। কিছু পুজোর যেমন থাকে পারিবারিক ও পৌরাণিক রীতি, তেমনি কিছু পুজোর নেপথ্যে থাকে অলৌকিক বিশ্বাস। তেমনই বর্ধমানের এই জমিদার বাড়ির পুজো। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে কলকাতা থেকে বর্ধমান আসেন প্রখ্যাত সূরা ব্যবসায়ী বিহারীলাল, নবাবের কাছ থেকে জায়গা কিনে শুরু করেন দুর্গাপুজো। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু অলৌকিক বিশ্বাসও। যেমন, সন্ধিক্ষণের আগে দেবীকে সাজানো হয় একটি ফলের মালা দিয়ে। বিছানো হয় সুসজ্জিত বিছানা। জ্বালানো হয় ১০৮টি প্রদীপ। এবং পদ্মের পাপড়ি সুসজ্জিত করে রাখা হয় দেবীর চরণে। প্রামানিক পরিবারের বিশ্বাস সেই সুসজ্জিত বিছানার উপর দিয়ে হেঁটেই দেবী বেদীতে অধিষ্ঠান করেন।

বর্ধমানের কোথায় হয় এই দুর্গাপুজো ?

বর্ধমান শহরের বেড়মোড় এলাকায় অবস্থিত প্রামাণিক বাড়ি। আজ থেকে ২০০ থেকে ৩০০ বছর আগে এই এলাকায় ছিল জঙ্গলে ঘেরা আর সেখানেই দেবী দুর্গার আরাধনা করতেন এক বৃদ্ধা। আজ থেকে প্রায় ২৬৩ বছর আগে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে কলকাতা থেকে বর্ধমান আসেন প্রমাণিক পরিবারের এক পূর্বপুরুষ। গড়ে তোলেন মন্দির শুরু করেন পুজো।

কীভাবে শুরু হয়েছিল প্রামানিক বাড়ির দুর্গাপুজো ? 

প্রামানিক বাড়ি পূর্বপুরুষ বিহারীলাল প্রামানিক ছিলেন কলকাতার প্রখ্যাত সূরা ব্যবসায়ী। আজ থেকে প্রায় ২৬৩ বছর আগে দেবীর স্বপ্নাদেশ পান তিনি। দেবীর স্বপ্নাদেশে তাকে জানান, বর্ধমানের বেড় মোড় এলাকার সেই ঘন জঙ্গলের ভিতরে রয়েছেন তিনি। এরপরেই বর্ধমানে আসেন বিহারীলাল প্রামানিক এবং স্বপ্নাদেশে দেখা সেই জায়গায় এসে দেখেন এক বৃদ্ধা মহিলা সেখানে দেবীকে অর্চনা করছেন। তিনি মনস্থির করেন এখানে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি কিন্তু এর মাঝখানেও আসে বাধা। তিনি জানতে পারেন জায়গাটি নবাবের।

নবাবের জায়গায় কিভাবে গড়ে উঠল মন্দির ? কিভাবে সেই জায়গায় তৈরি হল দুর্গা দালাল ?

জায়গাটির নবাবের জানতে পেরে তিনি সরাসরি দেখা করেন তৎকালীন নবাবের সঙ্গে। নবাবকে জানাবে তার স্বপ্ন দেশের কথা। নবাব ও রাজি হয়ে যান তাকে সেই জায়গা বিক্রি করতে। এরপর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিহারীলাল প্রামানিক সেই জায়গায় গড়ে তোলেন বর্তমান এই প্রামানিক বাড়ি এবং দুর্গা দালান। ধুমধাম করে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা।

আর্থিক কারণে জংজমক কিছুটা কমলেও আজও পুরনো রীতিমে নেই এখানে পূজিত হন দেবী। এই পুজোয় রয়েছে বিশেষ কিছু রীতি যা আজও পালন করে চলেছেন প্রামানিক পরিবারের সদস্যরা। সন্ধিক্ষণে এখানে দেবীর সামনে বিছানো হয় সুসজ্জিত বিছানা।গত ২৬৩ বছরের এই বিশ্বাসে আজও ধরেনি কোনো ফাটল। ঘটেনি কোনো ব্যতিক্রমও।

কেন জানেন ?

প্রামানিক পরিবারের বর্তমান সদস্য চৈত্র প্রামানিক বলেন,তাদের পরিবারে দুর্গারাধনায় নেই কোনো বলি প্রথা। পরিবর্তে সন্ধিক্ষণের ঠিক কিছুটা আগে এখানে ফল দিয়ে মালা সাজানো হয়। পুজোর পর সেই ফল নেওয়ার জন্য যে হুড়োহুড়ি ২৬৩ বছর আগে ছিল এখনও তা বর্তমান। বলি প্রথা না থাকায় ১০৮টি প্রদীপ ও পদ্মের পাঁপড়িকে সুসজ্জিত করে রাখা হয় মায়ের চরণে। দেবীর বেদির সামনে বিছানো হয় গদিতে মোরা সুসজ্জিত বিছানা।তাদের বিশ্বাস সন্ধিপুজোয় মা প্রতিবার সেই বিছানার ওপর দিয়ে চলে আসেন এই পরিবার এবং দেবী বেদীতে অধিষ্ঠান করেন।

তিনি বলেন, এখানে দেবী দুর্গার সঙ্গে শুধু তার চার সন্তানই নয়, থাকেন তার দুই সখী জয়া বিজয়াও। প্রতিবছরই দেবীর সঙ্গে পূজিত হন তাঁর দুই সখীও। অর্থাৎ জয়া ও বিজয়াও পূজিত হন। পাশাপাশি প্রয়াত বিহারীলাল প্রামাণিকের সময়ে যে কাঠামোয় মায়ের চিন্ময়ী মূর্তি তৈরী হয়েছিল সেই কাঠামো আজও বর্তমান। চৈত্র বাবুর দাবি,এখনও তাতে কোনো ক্ষতি হয়নি। প্রতিবছর বিসর্জনের পরের দিন সকালে ওই কাঠামোকে তুলে নিয়ে আসা হয় দুর্গা দালানে। পরের বছর আবার সেই কাঠামোতেই দেবীর মূর্তি তৈরী হয়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *