মনোজ বন্দোপাধ্যায়, পশ্চিম বর্ধমান: নবপত্রিকা গণেশের পাশে না থেকে থাকে কার্তিকের পাশে। আবার দুর্গার বিসর্জনের আগেই হয়ে যায় মা মনসার বিসর্জন। জমিদারি নেই, সে সব চলে গেছে অনেক আগেই কিন্তু জমিদার আমলের সেই ঐতিহ্য আজও অটুট। পুজোর চারদিন যেন হারিয়ে যাওয়া একান্নবর্তী পরিবারকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে। সারা বছর যে যেখানেই থাকুন না কেন, দুর্গাপুজোর চারদিন সবাই জড়ো হয় দুর্গা দালানে। দু’বেলা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আর পুজোর ব্যস্ততায় কুলডিহা চট্টোপাধ্যায় বাড়ি যেন ফের এক হয়ে ওঠে।
তবে কাঁকসার কুলডিহা জমিদার বাড়ির পুজোয় রয়েছে ঐতিহ্যই একটু ভিন্ন রকমের। প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো এই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা ১১১১ বঙ্গাব্দে। সেই সময় জমিদার জনকিনাথ চট্টোপাধ্যায় এই পুজোর সূচনা করেন। বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় এখানে বলির প্রচলন নেই। প্রাচীন রীতি মেনেই আজও পুজো হয়ে আসছে। এককালের আড়ম্বর পুজোর জৌলুসে তার ছাপ আজও স্পষ্ট। কুলডিহার দুর্গামন্দিরের দুই পাশে রয়েছে দুই শিবমন্দির। রয়েছে মা মনসার মন্দির এবং একদিকে রয়েছে রঘুনাথের মন্দির। কাঁকসা মুচিপাড়া-শিবপুর রাস্তার ধারে রয়েছে কুলডিহার তালপুকুর, লক্ষ্মীসায়ের। জমিদার জনকিনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর নামেই পুকুরটির নাম রেখেছিলেন লক্ষ্মীসায়ের। এই পুকুরের জলেই হয় নবপত্রিকার স্নান। তারপর দোলায় করে নবপত্রিকা নিয়ে আসা হয় চ্যাটার্জী বাড়িতে।
বাড়ির বিবাহিত মহিলারা এরপর নবপত্রিকার দোলা বরণ করেন। আর এখানেই রয়েছে এই বাড়ির পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব। শুধু পুজোর রীতিতেই নয়, ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য। বাড়ির পুরুষ সদস্যরাই ভোগ রান্না করেন। সপ্তমীর দিন সাত সের চালের ভাত, সাত রকম ভাজা, তরকারি, ডাল, চাটনি, লুচি ও পায়েস নিবেদন করা হয় আটটি থালায়। তার মধ্যে সাতটি মা দুর্গার জন্য এবং একটি রঘুনাথের জন্য। অষ্টমীর দিন আবার আট সের চালের ভাত, আট রকম ভাজা, তরকারি, ডাল, চাটনি, লুচি ও পায়েস নিবেদন করা হয় ন’টি থালায়, যার মধ্যে যথারীতি একটি রঘুনাথের এবং বাকি আটটি মা দুর্গার জন্য। আর নবমীর দিন চালে-ডালে নয় সেরের খিচুড়ি, নয় রকম ভাজা, একটি তরকারি, ডাল, চাটনি, লুচি ও পায়েস দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। সেই দিন রঘুনাথ ফলাহার করেন।
নবমী এবং মাকুড়ী সপ্তমী, বছরে মাত্র এই দু’দিনই রঘুনাথ অন্নগ্রহণ করেন না। বাকি দিনগুলিতে তিন রকম পদের সঙ্গে অন্ন নিবেদন করার রীতি রয়েছে এই বাড়িতে। সন্ধিপুজোর পর বাড়ির মহিলারাও মেতে ওঠেন দাঁড় সিঁদুর খেলায়। আর দশমীতে এসে এই পুজোর ঐতিহ্য আরও অন্যরকম হয়ে ওঠে। দুর্গার দোলা বিসর্জনের আগেই হয় মা মনসার বিসর্জন। সন্ধ্যায় পাশের হাজরাপাড়ার মানুষজন জমিদারি আমল থেকে চলে আসা লাঠিখেলার প্রদর্শনী করেন। সেই ঐতিহ্য মেনেই কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় পাশের জানকি বাঁধে। সেখানেই হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। বদলেছে অনেক কিছুই। কিন্তু কুলডিহা চট্টোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও থেকে গিয়েছে সেই পুরনো দিনের ঐতিহ্য।