কলকাতা: চোরবাগানে বিপর্যয়ের পর আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজে। সেখানকার জুনিয়র চিকিৎসকরা শনিবার রাতেই অভিযোগ করেন, জখম অনেককেই কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজে ভর্তি করার পর অ্য়াপোলো হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁদের দাবি ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আকচাআকচি।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এক জুনিয়র চিকিৎসক বলেছেন, ‘কারা কারা আপনাদের রোগীদের অ্য়াপোলোতে চিকিৎসা করাতে চান। এই ধরনের কথা একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলছেন।’
কারও পাঁজর ভেঙে টুকরো টুকরো। কারও মস্তিষ্কে প্রবল রক্তক্ষরণ। কারও ফুসফুস ফেটে মৃত্যু। চোরবাগানে পুজো প্য়ান্ডেলে নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট দেখে শিউরে উঠছেন অনেকেই। আনন্দ করতে গিয়ে, কী নিদারুণ কষ্ট ভোগ করে মরতে হল এতগুলো মানুষকে।
বিপর্যয়ের পর আহতদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজে। সেখানকার জুনিয়র চিকিৎসকরা শনিবার রাতেই জানান, জখম অনেককেই কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজে ভর্তি করার পরই, অ্য়াপোলো হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার তোড়জোড় শুরু করে দেওয়া হয়। এক জুনিয়র চিকিৎসকের কথায়, ‘ভর্তি হওয়ার যে কাগজপত্র সরকারি হাসপাতালে সেগুলো তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমাদের কাছে নির্দেশ এল একেবারে উপরমহল থেকে অর্থাৎ স্বাস্থ্যভবন হয়ে MSVP হয়ে, বিভাগীয় প্রধানদের তরফ থেকে আমাদের কাছে যে নির্দেশ এল যে রোগীর আত্মীয়দের কাছে একটা অপশন রাখা হোক যে তারা কি তাঁদের রোগীর যে দ্রুত চিকিৎসা সেটা কি তাঁরা অ্য়াপোলোর মতো যে বড় বড় কর্পোরেট, প্রাইভেট যে হাসপাতাল সংস্থা সেখানে করাতে চায়? তাঁকে আমরা নিজেদের চোখে দেখি তিনি একাধিক রোগী পরিজনকে বলছেন যে কারা কারা আপনাদের রোগীদের অ্য়াপোলোতে চিকিৎসা করাতে চান। এই ধরনের কথা একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলছেন। তখন রোগীদের ভিড় ছিল এমার্জেন্সিতে।’
বিজেপি বিধায়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্য়ায় বলেছেন, ‘আহত অবস্থায় যারা এসেছে তারা সবাই এখানে ভর্তি করা হয়েছিল। তারপরে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে তারা কী চায় সেটা দেখে নিন। তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী যেগুলো ব্যবস্থাপনা নেওয়ার রাজ্য সরকার নিয়েছে।’
কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজ। যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসেন। সেখানে পদপিষ্ট হয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসার পরিকাঠামো থাকবে না কেন? কেন তাঁদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাতে হবে? এই প্রশ্নের আবহেই পরিকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজের জুনিয়র চিকিৎসকরা।
এক জুনিয়র চিকিৎসক বলছেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজ নাকি একটি টার্সিয়ারি কেয়ার হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনও ট্রমা কেয়ার সেন্টার নেই। ন্যূনতম যে জরুরি ওষুধ সেগুলো ওয়ার্ডে পাওয়া যায় না। আমাদের হাসপাতালে ন্যূনতম ক্লট ভায়েল থেকে শুরু করে ৫ ml সিরিঞ্জ, ১০ ml সিরিঞ্জ পর্যন্ত থাকে না।’
শারদ্বত মুখোপাধ্য়ায় সাফ বলছেন, ‘আমি তো এই বয়সে গিয়ে অসৎ বা মিথ্য়ে কথা বলা আমার শোভা পায় না। ওরা বাচ্চা ছেলে ওরা বলতে পারে।’
কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজ থেকে অ্য়াপোলো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল কেন? রাজ্য়ের প্রথিতযশা সরকারি মেডিক্য়াল কলেজের এই হাল কেন? যে সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য় প্রতিদিন কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজে আসেন, তাঁদের আস্থা-ভরসায় কি এই ঘটনা ধাক্কা দিল না? প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টারের চিকিৎসক ও সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র বলছেন, ‘পদপিষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে যাঁরা বেঁচে গেলেন, গুরুতর আহত হলেন, তাঁদেরকে কি কলকাতা মেডিক্য়াল কলেজ – এশিয়ার সবচেয়ে প্রথম একটা মেডিক্য়াল কলেজ…সেখানে চিকিৎসা করা যেত না? সব রোগীকে কি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে? কোনওভাবে কি সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি প্রশাসনেরও আস্থা চলে যাচ্ছে? সরকারি চিকিৎসা পরিকাঠামোগুলো একটু উন্নত করুন।’
এনিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। রবিবার সকালে আহতদের খোঁজ নিতে অ্যাপোলো হাসপাতালে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।