কমলকৃষ্ণ দে, মেমারি: কালীপুজোর পরের দিন রাত বারোটা বাজলেই গ্রামে জ্বলে ওঠে মশাল, বাজতে শুরু করে ঢাক, কাঁসর আর কাঁধে চড়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হন চার বোন। বড়কালী, মেজকালী, সেজো কালী ও ছোট কালী।
পূর্ব বর্ধমানের মেমারির আমাদপুর, এখানে দুর্গাপুজো নয় কালীপুজোকে কেন্দ্র করেই মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। উৎসবে মেতে উঠে গোটা গ্রাম। এখানে মা কালীরা চার বোন। বড়মা, মেজমা, সেজমা, ছোটমা।
এছাড়াও সিদ্ধেশ্বরী, বুড়িমা, ডাকাত কালী, খ্যাপা মা, বামাকালী, আনন্দময়ী মা – বিভিন্ন নামে একশোরও বেশি পুজো হয় এই গ্রামে। তাই কালীগ্রাম নামে পরিচিত এই গ্রাম। কালীপুজো উপলক্ষে দূর দূরান্ত থেকে আসেন বহু মানুষ। পুজো ঘিরে রয়েছে নানান কাহিনি।
মেমারির আমাদপুর এক প্রাচীন জনপদ। বড় কালীর মন্দির এর পাশ দিয়ে প্রবাহিত বেহুলা নদী। কথিত আছে, এক সময়ে বণিকদের বাণিজ্য তরী যাতায়াত করত বেহুলা নদী দিয়ে। সেই সময়ে বণিকদের দস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্ব খোয়াতে হতো। আমাদপুরে বেহুলা নদীর ধারে ছিল মহাশ্মশান। শ্মশানে এক সাধু কালীসাধনা করতেন। বণিকরা দস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে এই শ্মশানে কালী মায়ের পুজো দিতে শুরু করেন। শোনা যায়, এর পর থেকেই তাঁরা দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে শুরু করেন। তখন থেকেই এই দেবীর প্রতি বিশ্বাস জন্মায় তাদের। মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পরে দিকে দিকে। যদিও বর্তমানে বেহুলা নদী মজে গিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। আর বড় কালীকে ঘিরেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে কালীপুজো। মা কালীর পাশাপাশি, এই গ্রামে ভৈরবেরও পুজো হয়।
পুজোর পাশাপাশি দেবী বিসর্জনও দেখার মতো ৷ পুজোর পরদিন রাতে চার বোনের যখন বিসর্জন শোভাযাত্রায় বের হন, তখন গোটা গ্রাম অন্ধকারে ঢেকে যায় ৷ দাউদাউ করে জ্বলে উঠে মশাল ৷ সেই মশালের আলো আধারের মাঝে বেজে ওঠে ঢাক ও কাঁসর ৷ প্রতিধ্বনিত হয় ‘জয় মা কালী’ ধ্বনি আর বাঁশের মাচায় করে ভক্ত ও বেয়ারাদের কাঁধে চড়ে প্রথম গ্রাম পরিক্রমায় বের হন বড়মা। কথিত আছে, বড়মার ছেলে ভৈরব। গ্রাম ঘুরতে বেরোনোর আগে মেজ বোনকে ডাকতে পাঠান ছেলেকে। সেই মতো ভক্তদের কাঁধে চড়ে মাসি অর্থাৎ মেজ মাকে ডাকতে আসেন ভৈরব। মেজো মাসি ছেলেকে মিষ্টিমুখ করান আর তারপরেই একে একে ভক্তদের কাঁধে চড়ে গ্রাম পরিক্রমা করেন বড়মা, মেজমা, সেজমা, ছোটমা ভৈরব সহ গ্রামের প্রায় ১০০টিরও বেশি কালীপ্রতিমা। পিছনে পিছনে আরও অগুন্তি ভক্তের সারি।
সুবিশাল প্রতিমা কাঁধে নিয়েই লাফিয়ে লাফিয়ে নাচের ভঙ্গি করেন ভক্তরা। দেখে মনে হয়, তাঁদের সঙ্গে নেচে উঠছেন স্বয়ং দেবীও। আর এই গ্রাম পরিক্রমা চলে প্রায় সারারাত ধরে। গ্রাম পরিক্রমা শেষে শুরু হয় বিসর্জন। প্রায় ৫০০ থেকে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই রীতি ৷ আর এই দৃশ্য দেখতে পূর্ব বর্ধমান জেলা সহ আশেপাশের জেলা থেকেও আসেন বহু মানুষ।। জনসমুদ্রে পরিণত হয় গোটা গ্রাম।
আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভাইরাল! কবে শুরু হয় শান্তিপুরের বামাকালীর বিখ্যাত নাচ? অজানা কাহিনি