সোমনাথ মিত্র, হাওড়া: হুগলি জেলার হরিপালে হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের মধুসূদনপুর ও চন্দনপুর রেল স্টেশনের মাঝে অবস্থিত নাচিনডাঙ্গা গ্ৰাম। আর এখানেই কয়েক শতাব্দী প্রাচীন বটবৃক্ষের নীচে কালী রূপে পুজিত হয়েছে আসছেন ‘নাচিনডাঙ্গা মা’। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে উৎসাহ উদ্দীপনার শেষ নেই।

এই পুজোতে কিন্তু কালী মায়ের (Kali Puja) কোনও মূর্তি নেই। আর তৈরী করাও হয় না। বছরের পর বছর ধরে বট গাছের নীচে ঘট স্থাপনার মাধ্যমে মায়ের আরাধনা করা হয় এখানে। একেবারে প্রথমে মাটির বেদীতে মাটির ঘটে পুজো অর্চনা হতো। পরবর্তীকালে ভক্তদের ইচ্ছায় মাটির ঘটের বদলে পিতলের ঘটে মায়ের পুজো শুরু হয়। সারাবছর সেই ঘটে পুজো অর্চনা হলেও, দ্বীপানিতা কালী পুজোয় ঘটা করে সারারাত পুজো হয়, বসে মেলা। অন্যদিকে বৈশাখ মাসেও মায়ের বাৎসরিক পুজা অনুষ্ঠিত হয়। জাগ্ৰত নাচিনডাঙ্গা মা কে ঘিরে রয়েছে অনেক অলৌলিক ঘটনা।।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ থেকে অনুমানিক আড়াইশো বছর আগে এই রাস্তা ধরে বর্ধমানের একটি পরিবার তার ছেলেকে নিয়ে  কালীঘাটে মানসীকের পুজো দিতে যাচ্ছিলেন একটি পাঁঠা নিয়ে। পথে নাচিনডাঙায় বটতলায় বসে বিশ্রাম নেন। তারপর আবারো রওনা দিয়ে কালীঘাটে পৌঁছবার পর কালীঘাটের মা স্বপ্নাদেশ দেন তুই যে গাজতলায় বসে বিশ্রাম নিয়েছিলিস সেখানে ফিরে যা, সেখানে ঘট স্থাপনা করে আমার পুজো নিবেদন করবি। সেইমতো সেই ব্যক্তি পুনরায় নাচিন ডাঙ্গায় ফিরে আসেন এবং ঘট স্থাপনা করে পুরোহিত নিয়ে এসে পুজো দেন, পাঁঠা বলি দেন। সেই থেকেই এখানে পুজো শুরু হয়। এবং তার পর থেকে ঘটে ই কালীঘাটের কালি রূপে পূজিত হয়ে আসছেন নাচিনডাঙ্গার মা। 

অন্য আরেক জনশ্রুতি আছে, বিট্রিশ আমলে যখন বটগাছের নিচে ঘটে মায়ের পুজো হতো তখন  হাওড়া- বর্ধমান কর্ড লাইন স্থাপনের সময় এই এলাকা দিয়ে রেল লাইন পাতার জন্য এলাকা পরিষ্কার শুরু হয়। হাতি এনে বট গাছের ডালপালা কাটতেই অসুস্থ হয়ে মাটিতে পরে লুকিয়ে পড়ে হাতি। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন দায়িত্বে থাকা এক আধিকারিক। তখন কালী মায়ের অস্বিত্ব বুঝতে পেরে তারা বট গাছ কাটা থেকে বিরত থাকেন। এবং রেল লাইনের রুট  কিছুটা দূর দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

খুব জাগ্রত এই মন্দিরে এখনো প্রচুর মানুষ তাদের মনস্কামনা নিয়ে মায়ের কাছে মানত করেন। একাধিক জটিল রোগ নিরাময় করেন মা। শারীরিক প্রতিবন্ধী একাধিক মানুষ মায়ের আশীর্বাদে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাই অনেকে মন্দিরে ঘোড়া উপহার দিয়ে গেছেন। দীপান্বিতা কালীপুজোয় লক্ষাধিক মানুষের ভিড় উপচে পড়ে মন্দিরে। লম্বা লাইন পরে পুজো দিতে। কালীপুজোর দিনেও কোন মূর্তি পুজো হয় না, ঘটেই  আরাধনা হয় মায়ের। 

স্থানীয় প্রবীন ব্যক্তি ক্রান্তিরাম মৈত্র বলেন, ‘একবার লাইন পাতার জন্য গাছ ভাঙতে গিয়ে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর রেল লাইন এখান থেকে দূরে সরে যায়। এখানকার মা খুব জাগ্ৰত। দূরে একটি পুকুর ছিল যেখানে আগে মা স্নান করতে যেত। তার প্রমাণও মানুষ পেয়েছে। পরবর্তীকালে মানুষজনের বসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই ঘটনার আর কোন প্রমান এখন পাওয়া যায় না।’ 

নাচিনডাঙ্গা কালীমাতা বারোয়ারি পুজো কমিটির সম্পাদক সৌমেন মৈত্র বলেন, ‘হাসপাতাল ফেরত রুগী মায়ের কাছে একমনে সাধনা করলে মা স্বপ্নাদেশ তাদের ঔষধ প্রদান করে। তাতে তাদের রোগ প্রতিরোধ হয়। শ্যামাকালী পুজোয় রাতে পুজো শুরু হয়। তারমাঝে বলিদান হয়, শুনো পোড়ানো হয় , বাতাসা ছড়ানো সহ একাধিক নিয়ম কানুন মেনে পুজো হয়।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *