নয়াদিল্লি: নোটবন্দির পর ১০ বছর কেটে গিয়েছে। তবে জাল নোটের কারবার থেমে নেই। পাশাপাশি, রমরম করে চলছে নকল কয়েন তৈরির কারবারও। দেশের একাধিক শহরে নকল ২০ টাকা তৈরি হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এল। (Counterfeit Coin Manufacture)
সম্প্রতি দিল্লি পুলিশের অপরাধ দমন শাখা ১ লক্ষ টাকা মূল্যের নকল ২০ টাকার কয়েন উদ্ধার করে। ৫০টি থলেতে আলাদা আলাদা করে বেঁধে সেগুলি সরবরাহ করা হচ্ছিল। সেই ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার হয়েছে ইতিমধ্য়েই। তবে নকল কয়েন তৈরির শিকড় একাধিক রাজ্যে বিস্তৃত বলে জানা যাচ্ছে। (Fake 20 Rupee Coin)
এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, হরিয়ানা, দিল্লি, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্য়ে নকল কয়েন তৈরির কারখানা রমরম করে চলছে। বাজারে কমপক্ষে ৭০ কোটি টাকা মূল্যের, ৩ কোটি ৫০ লক্ষ নকল ২০ টাকার কয়েন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
হরিয়ানার সোনীপতের একটি কারখানায় গত ১০ মাস ধরে নকল ২০ টাকার কয়েন তৈরি করা হচ্ছিল। অথচ সকলে জানতেন স্ক্রু-ড্রাইভার তৈরি হয় ওই কারখানায়। হাতেগোনা কয়েক জন মিলে নকল কয়েন তৈরির ওই ইউনিটটি চালাচ্ছিল। ১৩ সেপ্টেম্বর আবার উত্তরপ্রদেশের সাহরানপুরে নকল কয়েন চক্রের সন্ধান মেলে। পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয় সেখানে। ছয়টি ভারী যন্ত্র উদ্ধার করা হয় তাদের কাছ থেকে।
আরও পড়ুন: দিয়া মির্জার দীপাবলি-ভিডিও ঘিরে বিতর্ক, আদালত বলল, ‘ভারত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ’
পুলিশ সূত্রে খবর, ধরা পড়ার ভয়ে সোনীপত থেকে উত্তরপ্রদেশে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল নকল কয়েন তৈরির সর়ঞ্জাম। তদন্তে নেমে জানা যায়, স্ক্রু ড্রাইভার নয়, আসলে নকল ২০ টাকার কয়েন তৈরি হচ্ছিল কারখানায়। ভারতে জাল নোটের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে আগেই জানা গিয়েছে। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে যেখানে ২ লক্ষ ১৭ হাজার ৩৯৬টি জাল নোট উদ্ধার হয়। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে হয় ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৭৪৬। তবে শুধুমাত্র কাগজের নোট নয়, ধাতু দিয়ে তৈরি নকল কয়েন তৈরির কারবারও যে রমরম করে চলছে, তা বোঝা যাচ্ছে।
ভারতে কাগজের নোট তৈরির দায়িত্ব রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার কাঁধে। কয়েন তৈরি করে ভারত সরকার। মুম্বই, কলকাতা, নয়ডা, হায়দরাবাদের টাঁকশালে তৈরি হয় ধাতব কয়েন। সেগুলিকে বাজারের অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব রিজার্ভ ব্যাঙ্কের। সেই কয়েন নকল করাকে ঘিরেই অপরাধের নতুন রাস্তা খুলে গিয়েছে। ধৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৭০ কোটি টাকা মূল্যের নকল কয়েন বাজারে ছেড়েছে তারা। এর আগে, ২০১৬ এবং ২০১৯ সালে দিল্লি ও হরিয়ানাতে নকল কয়েন তৈরির কারখানার হদিশ মেলে।
আরও পড়ুন: এবার হুমকি পেলেন অভিনেতা তুষার কপূর, ৫ কোটি টাকা চেয়ে এল ফোন, নেপথ্যে সেই বিশ্নোই গ্যাং?
সাহরানপুর থেকে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা ৫০০ স্কোয়্যার ফুট জায়গার খোঁজ করছিল। সেখানে ছয়টি ভারী যন্ত্র বসানো যায় যাতে, সেকথা জানিয়ে রেখেছিল। গতিবিধি দেখে সন্দেহ জাগায় পুলিশের কাছে খবর পৌঁছে যায়। সেই ঘটনায় উপকার লুথরা ওরফে অভয় প্রতাপ সিংহ, হিমাংশু ওরফে গুল্লু এবং কুলদীপকে গ্রেফতার করা হয় প্রথমে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সন্ধা মেলে সন্তোষ চৌরাসিয়া ওরফে জনার্দন, অনুরাগ পাল ওরফে লঙ্কেশের। চারটি আলাদা আলাদা গাড়িতে হসেছিল তারা। তাদের কাছ থেকেও ৬৪০০ নকল ২০টাকার কয়েন উদ্ধার হয়, যার বাজারমূল্য ১.২৮ লক্ষ। ঘষামাজা কিছুটা বাকি, এমন আরও ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের নকল কয়েনও উদ্ধার হয়। পুলিশের দাবি, বিভিন্ন রাজ্যে এই চক্র চালানোর কথা স্বীকার করেছে ধৃতরা।
কিন্তু নকল ২০ টাকার কয়েন কী ভাবে তৈরি হচ্ছিল? পুলিশ জানিয়েছে, ছয়টি ভারী যন্ত্র, লোহার ছাঁচ এবং অন্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছিল। দিল্লির একটি কারখানা থেকে অ্যালুমিনিয়াম, তামা এবং নিকেলের মিশ্রণে তৈরি মুদ্রার আকারের রিং সংগ্রহ করা হতো প্রথমে। এর পর ২০ টাকার কয়েনের আদলে তৈরি ছাঁচ আনা হতো দিল্লির একটি কারখানা থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে। রিংয়ের উপর ছাঁচ বসিয়ে চাপ দেওয়া হতো। বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্য়ে ঘষামাজা করে নিখুঁত এবং মসৃণ করে তোলা হতো কয়েনগুলিকে, যাতে সেগুলি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং সঠিক আকার পায়। কয়েনের চিহ্নযুক্ত ২০টি ছাঁচ, চিহ্নহীন ২৯টি ছাঁচ বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। দু’টি ঘষার পাথর, চারটি ব্রাশ, আটটি ফাইল, পাঁচটি হাতুড়ি, একটি করাত, একটি ভাইস, ১৬টি রেঞ্চ, ছয়টি স্প্যানার, একটি স্ক্রু ড্রাইভার, একটি ভার্নিয়ার ক্যালিপার এবং একজোড়া প্লায়ার্সও মিলেছে।
অভিযানের সময় পুলিশ ৩৯টি চিহ্নহীন ও ২০টি চিহ্নযুক্ত ডাই, একটি ডাই-পলিশিং মেশিন, দুটি গ্রাইন্ডিং স্টোন (ঘষার পাথর), চারটি ব্রাশ, আটটি ফাইল (ধাতু ঘষার সরঞ্জাম), পাঁচটি হাতুড়ি, একটি লোহা কাটার করাত, দুটি পাইপ রেঞ্চ, একটি ভাইস (বস্তু আটকে রাখার যন্ত্র), ১৬টি রেঞ্চ, ছয়টি স্প্যানার, একটি স্ক্রু-ড্রাইভার, এক জোড়া প্লায়ার্স এবং একটি ভার্নিয়ার ক্যালিপার উদ্ধার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দৈনিক ১০-১২ হাজার নকল কয়েন তৈরি করা হতো। একসঙ্গে ১০০টি প্যাকেট সরবরাহ করা হতো বাজারে। ছোট শহরের টোল প্লাজা, মদের দোকান এবং খুচরো দোকানের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হতো সেগুলি। কিছু অল্পবয়সি ছেলেমেয়েকে এই কাজে লাগানো হয়। কিন্তু নকল কয়েন ছড়ানো হচ্ছে বলে টের পায়নি তারা।
বড় অঙ্কের নোট হাতে পাওয়ার পর উল্টেপাল্টে তা দেখেন অনেকেই। কিন্তু কয়েন নিয়ে তেমন মাথা ঘামানো হয় না। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বাজারে নকল কয়েন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ২০ টাকার কয়েন আসল না নকল, তা বোঝার কিছু উপায় রয়েছে-
- আসল ২০ টাকার কয়েনের আকার সম্পূর্ণ গোল নয়। বরং, সেটিতে ১২টি কোণ রয়েছে। নকল কয়েনগুলি অধিকাংশ সময়ই গোলাকার হয়।
- আসল ২০ টাকার কয়েনের কিনারা মসৃণ হয়। অর্থাৎ বাইরের দিকে কোনও খাঁজ বা দাগ থাকে না।
- দু’টি ধাতু দিয়ে তৈরি করা হয় আসল ২০ টাকার কয়েন। বাইরের বলয়টি তৈরি হয় নিকেল সিলভার দিয়ে। ভিতরের অংশে থাকে নিকেল ব্রাস। সংযোগস্থলটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং মসৃণ হয়। নকল কয়েনের ক্ষেত্রে সংযোগস্থল অমসৃণ বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
- আসল ২০ টাকার কয়েনের উল্টো পিঠে ভারতীয় শস্যের নকশা থাকে। পাশাপাশি, হিন্দি এবং ইংরেজিতে লেখা থাকে কয়েনের মান। সামনের দিকে আবার অশোক স্তম্ভের প্রতীকের পাশাপাশি, স্পষ্ট এবং নিখুঁত ভাবে খোদাই করা থাকে ‘সত্যমেব জয়তে’ লেখাটাই।
- আসল ২০ টাকার কয়েনের ওজন ৮.৫৪ গ্রাম। ব্য়াস ২৭ মিলিমিটার। নকল কয়েন তুলনামূলক হালকা মনে হতে পারে। অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল এবং চকচকে হতে পারে নকল কয়েন।