কমলকৃষ্ণ দে, বর্ধমান: দেবী দুর্গা তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা। পুরাণে অন্তত সেটাই লেখা রয়েছে আর সেই রূপেই মানুষ দেবীকে দেখতে অভ্যস্থ। তবে বর্ধমানের এই পরিবারে যে দেবী পূজিত হন, তাঁর গায়ের রং কালো! অবাক করা এই দেবীমূর্তি পূজিত হন, বর্ধমানের ভট্টাচার্য পরিবারে। এখানে দেবী পূজিত হন, ভদ্রকালী রূপে। এখানে পুজোয় মা দুর্গার ভোগে নিবেদন করা হয় পান্তা ভাত থেকে শুরু করে লেবু, কাঁচা লঙ্কা, টক দই ইত্যাদি। ৩০০ বছর ধরে ভট্টাচার্য পরিবারে এই রূপেই পূজিত হন দেবী। বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলায় পূর্বপুরুষ হরিদেব ভট্টাচার্য প্রথম শুরু করেন এই পুজো।
স্বপ্ন পেয়ে দেবীর পুজো শুরু ভদ্রকালী রূপে, বাংলাদেশে শুরু পুজো আসে এইদিকে
দেবীর গায়ের রং কেন কালো, সেই বিষয়ে এই পরিবারে প্রচলিত একটি ইতিহাস রয়েছে। স্বপ্নাদেশ পেয়েই তৈরি হয়েছিল, এই কালো রঙের প্রতিমা। তবে মা এখানে দশভূজা। মা-কে এখানে ভদ্রকালী দুর্গা রুপে পুজো করা হয়। তবে দেবী দুর্গার গায়ের রং কালো হলেও ,দেবীর সন্তানদের গায়ের রং কালো নয়। একেবারেই স্বাভাবিক। পরিবারে বর্তমান সদস্য জানান, হরিদেব ভট্টাচার্য স্বপ্নাদেশ পান, দেবীকে এই ভদ্রকালী রূপে পুজো করার জন্য। সেই থেকেই শুরু হয় এই পুজো। ১৯৩৫ সাল নাগাদ নীরদ গোপাল ভট্টাচার্য কর্মসূত্রে আসেন আসানসোলে। ১৯৩৯ সালে কলকাতায় আসেন তার মেজো ও সেজো জেঠুরা। ১৯৪৬ সালে ভারত ভাগের আগে তার বাবা সপরিবারে বাকি সদস্যদের নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। বাংলাদেশ থেকে চলে আসার পরে, কালনার গুপ্তিপাড়ায় কিছুদিন হয়েছিল এই পুজো।
পুজোর ভোগে থাকে বিভিন্ন মাছ, সন্ধি পুজোয় আরাধ্য দেবী চামুণ্ডা
এরপর জয়ন্তবাবুর বড় জেঠু আসানসোলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এই পুজো করেন। পরিবারের অনান্য সদস্যরা ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত দুর্গাপুরে দুর্গাপুজো হয় এরপর কলকাতার বেলেঘাটায় পরিবারের সদস্যরা এই পুজো শুরু করেন তা চলছে এখনও। ২০১৩ সালে জয়ন্তবাবু তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে এই পুজো শুরু করেন বর্ধমানের ৫ নং ইছলাবাদে তাঁর বাড়িতে। জয়ন্তবাবু আরও জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ বিশেষ তন্ত্রমতে এই পুজো হয়। প্রচলিত ধ্যানের কিছুটা পরিবর্তন রয়েছে এই পুজোয়। ষষ্ঠী থেকে পুজো শুরু হয়। সন্ধি পুজোতে মা চামুণ্ডার পুজো হয়। পুজোর সময় প্রতিদিনই মায়ের ভোগে থাকে আড় মাছ, বোয়াল মাছ, কাতলা, পাবদা প্রভৃতি মাছ। নবমীর দিন দেওয়া হয় ইলিশ মাছ। সন্ধিতে ভদ্রকালী দুর্গারূপী চামুণ্ডার পুজো হয়। দশমীর দিন দেওয়া হয় পান্তা ভাত, লেবু, কাঁচা লংকা, টক দই, ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক, ৫ রকম ভাজা সহ দুরকম তরকারী। সপ্তমীর দিন খিচুরি ভোগ এবং অষ্টমীতে পোলাও সহ নিরামিষ ভোগ। নবমীতে ফ্রায়েড রাইস, দুরকম মাছ ছাড়াও পাঁঠা বলি হয়। সপ্তমী, সন্ধি পুজো এবং নবমীতে তিন দিন পাঁঠা বলি হয়। ভোগে থাকে চাটনী, পায়েস, লুচি, নারকেল নাড়ু প্রভৃতি।
বর্ধমানে এই মূর্তি গড়েন দীনবন্ধু পাল। এক চালা এই দুর্গাপ্রতিমা চতুর্ভূজা ভদ্রকালী, দয়াময়ী মূর্তি। এই প্রতিমায় বিশেষত্ব হল, কার্তিক ও গণেশের স্থানবদল হয় এখানে। দেবীর বামদিকে থাকেন গণেশ এবং ডানদিকে থাকেন কার্তিক। জয়ন্তবাবু জানিয়েছেন, তাঁর বাড়ির এই পুজোয় তাঁর স্ত্রী মাধবী ভট্টাচার্য, মেয়ে শ্রেয়া ভট্টাচার্য ছাড়াও থাকেন ভক্ত ও শিষ্যরাও। পঞ্চমীতে গুরু পুজো দিয়ে শুরু হয়। প্রত্যেকদিন চণ্ডীপাঠ হয়।