কমলকৃষ্ণ দে, পূর্ব বর্ধমান: আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন পরেই, উমা আসবে বাড়িতে। বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোয় যেমন প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে, তেমনই জোরকদমে আয়োজন চলছে, বিভিন্ন বাড়ির পুজোতেও। আর বাড়ির পুজো মানেই, সেখানে রয়েছে বিভিন্ন বিশেষত্ব। এক এক দেবীর, এক এক রূপ। দেবীর এখানে কোনও বাহন নেই। মহাদেব, কার্তিক গণেশের বাহন থাকলেও ,দেবী দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতীর কোনও বাহন নেই। মহাদেবের বাম উরুতে বসে থাকেন মা দুর্গা। মহাদেবের পাশে থাকেন ষাঁড়। দেবী এখানে দশভুজা নন, দ্বিভূজা। দেবীর কোনও মহিষাসুর নেই। তবে সন্তানরা সকলেই রয়েছেন। মহাদেব, গণেশ ও কার্তিকের বাহন রয়েছে। কিন্তু দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর বাহন থাকে না। আনুমানিক আড়াইশো বছর ধরে পূর্ব বর্ধমানের বড়শুলের ‘দে’ বাড়িতে পুজিত হচ্ছেন হরগৌরী।
চোখ বেঁধে দেবী প্রতিমাকে বেছে নিল শিশুকন্যা, সেই থেকেই শুরু হল পুজো
এই পরিবারের পুজোর প্রচলন নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনী। বড়শুলের জমিদার বাড়ির জমিদার তখন যাদব চন্দ্র দে। প্রথমে তিনি ঘটে পুজো শুরু করেন। জমিদার গৌরপ্রসাদ দে এর আমল থেকে শুরু হয় মূর্তি পুজো। মতান্তরে জানা যায়, গঙ্গাসাগরে যেসব সাধুসন্তরা যেতেন, তাঁরা দেবীকে হরগৌরী রূপে পুজো করার পরামর্শ দেন। কারণ মনে করা হত, দেবীকে এই রূপে পূজা করলে ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি পায়। আরও একটি মত বলে, তৎকালীন সময়ে বড়শুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দামদর নদ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য চলত। আবার বড়শুলের খুব কাজ দিয়ে গিয়েছে গ্রাণ্ড ট্যাঙ্ক রোড অর্থাৎ জিটি রোড। দামোদর নদ ও জি টি রোড কাছাকাছি হওয়ায় একসময় এই জমিদার বাড়িতে সাধুসন্তরা এসে থাকতেন। কথিত আছে, জমিদার গৌরপ্রসাদ দে-র আমলে তেমনই সাধুসন্তরা এসে ঝোলা থেকে বেশ কয়েকটি মা দুর্গার বেশ কয়েকটি রূপের মাটির পুতুল বের করেছিলেন। তারপর পরিবারের এক কন্যাশিশুর চোখ বেঁধে একটি পুতুল তুলতে বলেছিলেন তাঁরা। সেই কন্যা শিশু হরগৌরীর পুতুলটি তুলেছিল। সেই থেকেই হরগৌরীর পুজো শুরু হয় এখানে। এছাড়াও স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী দেবীর এরকম মূর্তি তৈরী করে মুর্তি পুজো শুরু হয়।
কি কি নিয়ম পালন করা হয়, এই দুর্গাপুজোয়?
তবে এই পরিবার বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় গুরুদেবের শরণাপন্ন হন কী রীতিতে দেবীর আরাধনা করা হবে। গুরুদেবের পরামর্শে শাক্ত মতে,গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসারে পুজো শুরু হয় এখানে। তাঁর পরামর্শেই সপ্তমীতে গোটা ছাঁচিকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। অষ্টমীতে ছাগবলি হয়। নবমীতে তিনটে ছাঁচিকুমড়ো, চারটি শসা, বাতাবি লেবু ও মূলসহ তিনটি আখ বলি দেওয়া হয়। তবে বলি দেওয়া কোনও জিনিসই এই পরিবারের কেউ আহার করতে পারেন না। আগে সন্ধিপুজোয় বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা বাড়ির পুজোর কামানের আওয়াজ শুনে সন্ধিপুজোর বলিদান শুরু হতো।বর্তমানে তা অতীত। সর্বমঙ্গলা মন্দিরে কামান দাগা কয়েক দশক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।বর্তমানে ঘড়ির সময় দেখেই বলিদান হয়। এই জমিদার পরিবারের একসময় তাম্বুল ও লবণ ও জাহাজের কারবার ছিল। দামোদর নদ ব্যবহার করে ব্যবসা বাণিজ্য করত। সেই আমলের জমিদারির নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে বড়শুল একটা বড় অংশে।
পুরনো গৌরব আর নেই, তবু রয়েছে পুজোর আন্তরিকতা
একসময় ঠাকুরদালানে রেড়ির তেলে ঝাড়বাতি জ্বলে উঠতো।দুর্গাপুজো উপলক্ষে আলোয় জলমল করে উঠতো ঠাকুরদালান সহ জমিদার বাড়ি। ঠাকুরদালানের প্রবেশ পথে ছিল বিশাল ঘণ্টা। কুইন্ট্যাল খানেক ওজন ছিল তার। সেই ঘন্টা বর্তমানে আর নেই। বর্তমানে পুজোয় আলো জ্বললেও এখন বৈদ্যুতিক ঝাড়বাতি লাগানো হয়। পুজোয় সেই জৌলুস এখন অনেকটাই ফিকে হয়েছে। কিন্তু পরম্পরা মেনে আজও নিয়ম নিষ্ঠার সহিত হরগৌরীর আরাধনা হয় ‘দে’ পরিবারে। আগে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। নবমী তে হতো বাঘ নাচ।মহিলারা পর্দানসীন থেকে তা দেখার সুযোগ পেতেন। তবে পুজোয় পরিবারের মহিলাদের অংশগ্রহণ বরাবরই রয়েছে এখানে। দশমীর দিনে দেবীকে কাঁধে করে গোটা গ্রাম ঘুড়িয়ে বিসর্জন করা হয়। আগের সেই আভিজাত্য না থাকলেও পরিবারের সব সদস্যরাই দুর্গাপুজোতে অংশগ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন: Big Boss Bangla: ‘বিগ বসের বাড়িতে সবচেয়ে বেশি নাটক করে সৃজলা! আর দুর্নিবার…’ এ কি বললেন সায়ক?