কলকাতা: প্রাণের পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। চোরবাগান সর্বজনীনের সেদিনের ঘটনায় এখনও চোখ বুঝলেই সেই বীভৎস দৃশ্য ভেসে উঠছে মৃতের আত্মীয়স্বজনদের। সেদিন মৃত্যুকে যাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, তাঁদের চোখে-মুখেও এখন একরাশ আতঙ্ক।
চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেছেন ছেলেকে, চোরবাগানের স্মৃতি মনে করে এখনও শিউরে উঠছেন বাবা-মা
প্রাণের পুজোয় প্রাণনাশ! চোরবাগানের পুজো দেখতে গিয়ে চলে গেছে প্রাণ! স্বামী স্ত্রী থেকে বাবা-ছেলে-প্রিয় দুই বন্ধু! …যারা আর কোনওদিন ফিরবে না! কিন্তু কারা এর জন্য় প্রকৃত দায়ী? ছিন্নবিচ্ছন্ন পরিবারগুলি এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে! বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা! চোরবাগানে মৃত প্রাঞ্জল সরকারের মা প্রিয়াঙ্কা সরকার বলবেন, ‘ওখানে লাশের স্তূপ হয়ে গেছিল। লাশের স্তূপ।’ চোরবাগানে মৃত প্রাঞ্জল সরকারের বাবা অনুকূল সরকার বলছেন, ‘ওই দৃশ্য আমি ভুলতে পারব না সারাজীবনে, মরার আগে পর্যন্ত ভুলতে পারব না যে সবাই হাত বাড়িয়ে বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করছে।’
‘একটু লাইট আর একটু পুলিশ যদি থাকত এত বড় দুর্ঘটনা হতই না’
পুজোতে মা-বাবা আর বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হৈ করে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল ১৩ বছরের প্রাঞ্জল। চোরবাগানের মণ্ডপে মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে ক্লাস এইটের পড়ুয়ার। উত্তর ২৪ পরগনার আগরপাড়ার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকেরা ছায়া। প্রাঞ্জলের মা-বাবা অঝোরে কেঁদে চলেছেন…বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। উৎসবের দিনে তাঁদের ঘর চিরদিনের জন্য অন্ধকার করে চলে গেছে ছেলে। চোরবাগানে মৃত প্রাঞ্জল সরকারের মা প্রিয়াঙ্কা সরকার বলছেন, ‘একটু যদি দাদা, একটু লাইট আর একটু পুলিশ…একটু লাইট আর একটু পুলিশ যদি থাকত এত বড় দুর্ঘটনা হতই না। কমিটির একটা লোক নেই। মেন এমার্জেন্সি গেটটা চেন দিয়ে তালা দিয়ে বন্ধ করা ছিল। ৩-৪টে পুলিশের গাড়িকে হাতজোড় করে করে বললাম যে আমাকে একটু মেডিক্যালে নিয়ে যান। আমার হাজব্যান্ড বলছে আমার ছেলে নেই। ওরা কেউ শোনেনি। অনেক পরে পুলিশ এসেছে।’
‘বাইকে করে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাই’
চোরবাগানে মৃত প্রাঞ্জল সরকারের বাবা অনুকূল সরকার বলছেন, ‘আমি বাইকে ছেলেকে বসিয়ে পিছনে জাপটে ধরে বসে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাই। মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সিতে আমিই প্রথম খবর দিই চোরবাগানে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটেছে। প্রচুর মানুষ আসবে। ডাক্তার আমার ছেলেকে দেখেই বলে দিয়েছিল, নেই।’ ঘটনার কয়েক মিনিট আগেও নিজের ফোনে চোরবাগানের মণ্ডপের ভিডিও করছিল প্রাঞ্জল। বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস এইটের পড়ুয়ার হাসি মুখটা তখনও পর্যন্ত সেই ভিডিওতে দেখা গেছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
‘অনেক পরে পুলিশ এসেছে’
ছেলে প্রাঞ্জলকে হারিয়ে শোকের মধ্যেও ক্ষোভের আগুন ঝড়ে পড়ছে তাঁর বাবার গলায়। অনুকূল সরকার বলছেন, ‘এখনও শিল্পী কেন বাইরে রয়েছে? সবার আগে তো ওই প্যান্ডেলের যিনি শিল্পী ছিলেন, তাঁকে অ্যারেস্ট করে ভিতরে ঢোকানো উচিত ছিল। একজন শিল্পীর নির্দেশনাতেই তো গোটা প্যান্ডেলটা তৈরি হয়েছে। এক্সিট গেটের হাইট কেন ৬ ফুট, সাড়ে ৬ ফুট ছিল?’ প্রিয়ঙ্কা সরকার বলছেন, ‘একটা খাকি রঙের ড্রেস পরা একটা লোক ছিল যে খুব হেল্প করছিল। ও লাস্টে মাথায় হাত দিয়ে বসে গেছে। পারছে না। আমার বর ওকে তুলে বলছে ভাই চল, করতে হবে, নাহলে সব মরে যাবে। তারপরে আস্তে আস্তে ৫-৬ টা পাড়ার লোক এসেছে। তার অনেক পরে পুলিশ এসেছে।’
কী উঠে আসবে তদন্তে? কী থাকবে রিপোর্টে? মৃতদের পরিবার চায়, প্রকৃত দোষীদের যেন শাস্তি হয়।