কলকাতা: টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন পশ্চিম ও পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। উপচে পড়েছে নদী, জলের তলায় চলে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। কার্যত সমুদ্রে ভেসে গেছে জনপদ। ঘাটাল, সবং, খেজুরি-সহ একাধিক জায়গায় নদীর জল বেড়ে ভাসছে গ্রাম, চাষের জমি, রাস্তা। জলবন্দি বহু মানুষ। যেদিকে দু’চোখ যায় শুধু জল আর জল। ডুবে গেছে চাষের জমি থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট। বাড়ি থেকে বেরনোর একমাত্র ভরসা নৌকা। কেউ কেউ সেটুকুও জোগাড় করতে না পেরে অসহায়। মুখে তোলার দু’টো ভাত কোথা থেকে আসবে, কেউই জানেন না। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, পশ্চিম মেদিনীপুরের ৭টি ব্লকের ৪১টি গ্রাম পঞ্চায়েত জলমগ্ন।
ফি বছর বর্ষা এলেই বানভাসি পরিস্থিতি হয় ঘাটালের। পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং, হুগলির আরামবাগ-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যায়। এবারও সেই ছবিটা বদলায়নি। বৃহস্পতিবার আকাশপথে একাধিক প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সবং ও আরামবাগে প্রশাসনিক আধিকারিক ও জন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ঘাটালের ধাঁচে এবার আরামবাগ মাস্টার প্ল্যানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। ঘাটালে শিলাবতী নদীর উপর ভাসাপোল ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। প্রতিদিন কয়েক হাজার বাসিন্দা এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন। টানা বৃষ্টিতে ভাসছে ঘাটালের মনসুকার পার্বতী চক এলাকা। পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের লাড়ো গ্রামে ভয়াবহ পরিস্থিতি। কারও বাড়িতে এক বুক জল। তো কোথাও রাস্তার উপর কোমর সমান জল। ঘরবাড়ি ছেড়ে কেউ আত্মীয় বাড়িতে চলে গেছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে। পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরিতেও জল-যন্ত্রণার করুণ ছবি। টানা বৃষ্টিতে জল থইথই হেড়িয়া ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। চরম নাজেহাল হচ্ছেন রোগী ও রোগীর পরিজনরা।
প্লাবিত এলাকার মানুষরা কী জানালেন ?
ঘাটালের বাসিন্দা শিখা শানকি বলেন, ”জল ঢুকছে, এবার কোথায় যাব, কী করব? খাওয়া দাওয়ার কষ্ট, টাকা পয়সার সমস্যা, কোথায় কী করব তার পাত্তা নেই। যেতে গেলে সাঁতরে যেতে হবে হাঁড়ি নিয়ে। নৌকা কোথায় পাব? এখানে নৌকা, ডোঙা নেই”। সবং-এর এক বাসিন্দা জানান, এক বুক জল চারিদিকে। এখানে ৩০-৪০টা বাড়ি আছে, সবাই এরকমভাবে ডুবে গেছে। এখন একটু জলটা কমেছে বর্তমানে। কিন্তু আগে যাওয়া আসা অসম্ভব ছিল। আমাদের নৌকা করে যেতে আসতে হত। সবং-এর আর এক বাসিন্দা দুর্গাপদ ক্য়ুইলা জানান, ‘এক গলা জল আছে বাড়ির ভিতর। ৮দিন হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া শুকনো মুড়ি আর শুকনো খাবার।’খেজুরির বাসিন্দা অরিন্দম গুড়িয়া বলেন, ”পুকুর এবং হাসপাতালের দাওয়া জলে জলমগ্ন। একদম সমান হয়ে গেছে। এখানে রাতে স্টাফ থাকতে পারে না। সাপের উপদ্রব প্রচণ্ড হয়। ব্যাঙ, সাপ, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ রোগীর বিছানায় ঘুরে বেড়ায়।”
আরও পড়ুন – রাত ৯ টার পরে…! কী এমন ঘটল যাদবপুর বিশ্ববিদ্য়ালয়ে ? কেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ক্য়াম্পাস
কী জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ?
বৃহস্পতিবার জলমগ্ন এলাকা হেলিকপ্টারে ঘুরে দেখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকও করেন তিনি। সবং-এর বিডিও অফিসে মুখ্যমন্ত্রীর পর্যালোচনা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পশ্চিম মেদিনীপুরে মৃত ২জনের পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য করা হবে। এই প্লাবনের জেরে যে ৩২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য করা হবে। জলমগ্ন এলাকায় ৫ দিনের রেশন দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ”প্রধানমন্ত্রী শস্য় বিমা যোজনার ক্যাম্প করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পান চাষি, ধান চাষিরা সেখানে নাম লেখাতে পারবেন। পিংলা, সবং, নায়ায়ণগড়ের সব বিধায়করা ছিলেন। বিডিওরা ছিল। স্বাস্থ্য দফতর ভাল কাজ করেছে। পুলিশকে আলাদা করে টাকা দেওয়া হয়েছে, তারা যাতে রেশন এবং ২০ লিটারের পানীয় জলের জার পৌঁছে দিতে পারে, সেই কাজগুলো তারা করছে।