ঋত্বিক প্রধান, এগরা: দুর্গাপুজো শেষ। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড ক্লাবের দুর্গাপুজো মণ্ডপ ঘিরে শুরু হয়েছে এক অন্যরকম জটিলতা।
পুজো মিটতেই মণ্ডপ ও প্যান্ডেল খোলার কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, তার আগেই মণ্ডপের বাঁশ ও কাপড়ের মাঝে বাসা বেঁধে ডিম পেড়েছে বাবুই পাখি। শুধু একটি বা দুটি নয়, একেবারে তিন-চারটি জায়গায় বাসা তৈরি করে ডিম ও ছানাদের নিয়ে বসবাস শুরু করেছে এই ছোট্ট পাখিরা। এর জেরে একদিকে যেমন আটকে গিয়েছে প্যান্ডেল খোলার কাজ, অন্যদিকে ব্যস্ত রাস্তার পাশে প্যান্ডেল থাকায় চরম সমস্যায় পড়েছেন পথচলতি সাধারণ মানুষ।
পুজোর আনন্দ শেষ হতেই মণ্ডপ বাঁধার মিস্ত্রিরা প্যান্ডেল ভাঙতে গিয়ে দেখতে পান এই অভিনব দৃশ্য। প্যান্ডেলের উপরিভাগে ও খুঁটির কাছাকাছি ঝুলছে নিখুঁত কারুকার্যে তৈরি বাবুই পাখির একাধিক বাসা। তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে কচি ছানাদের কিচিরমিচির আওয়াজ।
প্যান্ডেল মিস্ত্রি বলেন, ”আমরা প্যান্ডেল খুলতে গিয়ে দেখতে পেলাম পাখির বাসা, যার মধ্যে রয়েছে ডিম এবং বাচ্চা। সেইগুলো তো আর ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা যায় না! তাই সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্লাব কমিটিকে বিষয়টি জানাই। প্যান্ডেলটি একদম রাস্তার পাশে রয়েছে, ফলে পাবলিক রাস্তার যাতায়াতে বহু সমস্যা হচ্ছে। পুজো তো কবেই শেষ হয়ে গিয়েছে, প্যান্ডেল তো খুলতেই হবে। তাছাড়া সামনেই কালীপুজোর প্যান্ডেল বাঁধার কাজ রয়েছে, এখন কী করব সেই নিয়েই বড় চিন্তায় পড়েছি।”
অদ্ভুত এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অসুবিধা দূর করতে হবে, তেমনই অবলা জীবগুলোর প্রাণও বাঁচাতে হবে। এই দ্বন্দ্বে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্লাব কর্তারা। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট জয়ন্ত সাহু বলেন, ”আমাদের দুর্গাপুজো মণ্ডপে এক অদ্ভুত ও নতুন ঘটনা ঘটেছে। তিনটি জায়গায় তিনটি বাবুই পাখি বাসা করেছে। ডিম সহ বাচ্চা রয়েছে। আমরা দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছি। প্যান্ডেল মিস্ত্রিরা এসে যখন আমাদের খবর দেয়, আমরা নিজেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখি। এরপর দীর্ঘ আলোচনার পর মিস্ত্রিদের আমরা বলেছি আপাতত প্যান্ডেল খোলার দরকার নেই।”
তিনি আরও জানান, পাখির পরিবারটিকে সুরক্ষিত রাখতে এবং নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা ইতিমধ্যেই বড় বড় ঝুড়ি কিনে এনেছেন। সেই ঝুড়িতে বেশি করে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে পাখির বাসাগুলো খুব সাবধানে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে কোনও বড় গাছে সেগুলোকে নিরাপদে ঝুলিয়ে রাখা যায়। একই সঙ্গে এই ঘটনার কথা বন দফতরকেও জানানো হয়েছে। বন দফতরের আধিকারিকদের সাহায্য নিয়ে কীভাবে পাখিগুলোকে পুরোপুরি সংরক্ষিত জায়গায় বা নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই চেষ্টাই এখন চালাচ্ছেন ক্লাব সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুজো শেষ হলেও এগরা ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এই ক্লাবের মণ্ডপ চত্বরে এখন প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই বাবুইপাখির পরিবার। ব্যস্ত শহরের কোলাহলে মানুষের আনন্দমঞ্চেই প্রকৃতির এই আপন খেয়াল এক অনন্য মানবিক নজির তৈরি করেছে। এখন দেখার, বন দফতরের সহায়তায় কতটা নিরাপদে ছানাদের নিয়ে নতুন ঠিকানায় পাড়ি দেয় এই বাবুই পাখিরা।