সুনীত হালদার, হাওড়া: প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস। লোকবিশ্বাস, স্বপ্নাদেশ আর অগাধ ভক্তির মেলবন্ধনে আজও পূজিত হন মা কালী। হাওড়ার বাগনানের খালোড় কালীবাড়িতে দক্ষিণা মহাকালী রূপে আরাধনা করা হয় দেবীকে। বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় কালীপুজোর দিন এই মন্দিরে ভক্তসমাগম থাকে চোখে পড়ার মতো। দীপান্বিতা অমাবস্যায় মাকে দর্শন করতে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ছুটে আসেন। প্রতিবছরের মতো এবারও কালীপুজো উপলক্ষে মন্দিরে থাকছে সারারাত বিশেষ পুজোর আয়োজন।

কথিত আছে, প্রায় পাঁচশো বছর আগে বর্ধমানের জমিদার কন্দর্পনারায়ণ রায়ের কাছে এলাকার প্রজারা কালীপুজো শুরু করার আবেদন জানান। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে জমিদারের উদ্যোগে দামোদর ও রূপনারায়ণ নদীর মধ্যবর্তী চর খালোড়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, পরবর্তীকালে জমিদার কন্দর্পনারায়ণ রায়কে স্বপ্নাদেশ দেন মা কালী। মন্দিরের পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত শচীন ভট্টাচার্যের কথায়, স্বপ্নাদেশ পেয়েই জমিদার এখানে স্থায়ীভাবে মায়ের পুজোর ব্যবস্থা করেন এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথমদিকে মন্দিরের বিগ্রহ ছিল অন্যরকম। কালের নিয়মে দু’বার বিগ্রহের ক্ষয় হওয়ায় নতুন প্রতিমা তৈরির প্রয়োজন পড়ে। এরপর পাশের গ্রাম বোড়ল থেকে একটি গোটা নিমগাছের গুঁড়ি এনে তৈরি করা হয় মায়ের প্রতিমা। সেই নিমকাঠের বিগ্রহেই আজও পূজিত হয়ে আসছেন দেবী। এখানে মা দক্ষিণা মহাকালী রূপে আরাধ্য।

সারারাত পুজো, আরতি, ছাগবলি ও প্রসাদ বিতরণ

কালীপুজোর দিন মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে মাকে সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে সাজিয়ে তোলা হয়। রাত ৯টা থেকে শুরু হয় বিশেষ পুজো। চলে সারারাত ধরে পুজো, আরতি এবং ছাগবলি। পুজো শেষে ভোরবেলা ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। মাকে দর্শন করতে সন্ধ্যা থেকেই মন্দির চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন ভক্তরা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় আরও বাড়ে।

মন্দিরের পুরোহিত সবুজ বটব্যাল জানান, বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনে এখানে বড় করে পুজোর আয়োজন করা হয়। তবে প্রতিদিনই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মায়ের নিত্যপুজো হয়। সকাল থেকে পুজো, ভোগ নিবেদন এবং সন্ধ্যায় আরতির আয়োজন থাকে। কালীপুজোর দিন দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে সারারাত বিশেষ পুজো চলে। ভোরে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

জাগ্রত দেবীর টানে ছুটে আসেন দূরদূরান্তের ভক্তরা

স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্তের বহু মানুষের বিশ্বাস, খালোড় কালীবাড়ির মা অত্যন্ত জাগ্রত। মায়ের কাছে মনস্কামনা জানাতে এবং পুজো দিতে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। এক ভক্তের কথায়, মায়ের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই বহু দূর থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মন্দিরে।

প্রায় পাঁচশো বছরের ঐতিহ্য, নিমকাঠের প্রাচীন বিগ্রহ এবং দক্ষিণা মহাকালী রূপে দেবীর আরাধনা—সব মিলিয়ে বাগনানের খালোড় কালীবাড়ি আজও ভক্তদের কাছে এক বিশেষ পীঠস্থান। কালীপুজোর রাতে মন্দিরের আলোকসজ্জা, বিশেষ পুজো এবং ভক্তদের সমাগমে এক অন্য আবহ তৈরি হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও একই নিষ্ঠায় বহন করে চলেছেন স্থানীয় মানুষ ও মন্দির কর্তৃপক্ষ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *