পূর্ব বর্ধমান: অমাবস্যার গভীর রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অথচ সেই রাতেই নাকি আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা! কোনও জাদু নয়, এক সন্ন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতায় নাকি ঘটেছিল এমনই ঘটনা। আর সেই সন্ন্যাসীর সাধনাস্থলেই আজও বিরাজ করছেন মা কালী। শুধু তাই নয়, এই মন্দিরে দেবীর ভোগের নিয়মও একেবারে অন্যরকম। প্রতিদিন নিয়ম করে শিয়ালকে নিবেদন করা হয় ভোগ। সপ্তাহের নির্দিষ্ট তিন দিন দেবীর পাতেও পড়ে আলু ভাতে, ঘি ভাত! আবার বিশেষ পুজোয় দেবীকে নিবেদন করা হয় শোল মাছ পোড়া ও কারণবারি। জঙ্গলঘেরা এক নির্জন সাধনাস্থল থেকে কীভাবে তৈরি হল এই মন্দির? কেনই বা দেবীর নাম দুর্লভা কালী? পূর্ব বর্ধমানের লাকুড্ডির এই মন্দির ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে এমনই নানা রহস্যময় কাহিনি।

অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ! মহারাজার সামনে কী ঘটেছিল?

পূর্ব বর্ধমানের লাকুড্ডি এলাকায় অবস্থিত মা দুর্লভা কালীর মন্দির। একসময় এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। জনবসতি ছিল কম। জঙ্গলের গভীরে দেবীর দর্শন পাওয়াও ছিল অত্যন্ত কঠিন। কথিত আছে, সেই কারণেই দেবীর নাম হয় ‘দুর্লভা কালী’।

এই মন্দিরের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে সন্ন্যাসী গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারীর নামের সঙ্গে। লোককথা অনুযায়ী, উপনয়নের পরেই সংসারের মায়া ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছন লাকুড্ডির ঘন জঙ্গলে। সেখানেই শুরু করেন মা কালীর সাধনা।

সেই সময় এই এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যেত বেহুলা নদী। কাছেই ছিল একটি পুকুর। নির্জন জঙ্গলের মধ্যে প্রকৃতির কোলে বসেই চলত তাঁর সাধনা। কথিত আছে, একদিন স্বপ্নে দেবী তাঁকে দর্শন দিয়ে নিজের বিগ্রহ উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন।

দেবীর স্বপ্নাদেশ মেনেই বিগ্রহ উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেন গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী। প্রথমে তালপাতার ছাউনি তৈরি করে শুরু হয় মা দুর্লভা কালীর আরাধনা। সেই ছোট্ট সাধনাস্থলই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে এক বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র।

অমাবস্যায় পূর্ণিমা দেখেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা!

দুর্লভা কালীবাড়ির সবচেয়ে চমকপ্রদ কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের সঙ্গে।

কথিত আছে, একদিন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় মহারাজা দেখতে পান, তালপাতার একটি ছোট্ট ছাউনির নীচে বসে সাধনা করছেন এক সন্ন্যাসী। তিনিই গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী। সন্ন্যাসীর সাধনায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর কাছে এগিয়ে যান মহারাজা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেদিন ছিল অমাবস্যা! আকাশে চাঁদের কোনও চিহ্নই ছিল না। লোককথা অনুযায়ী, এরপরই গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজাকে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখান। অমাবস্যার অন্ধকার রাতেই নাকি দেখা মিলেছিল পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার!

সন্ন্যাসীর এই অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি শুনে এবং তাঁর সাধনায় মুগ্ধ হয়ে মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাব মন্দির নির্মাণের জন্য জমি দান করেন। এরপরই লাকুড্ডিতে গড়ে ওঠে মা দুর্লভা কালীর মন্দির। মন্দিরের পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন না কেউ! দুর্লভা কালীবাড়ির আর একটি বিশেষ আকর্ষণ হল মন্দিরের ভিতরে থাকা পঞ্চমুণ্ডির আসন। তন্ত্রসাধনায় এই আসনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কথিত আছে, এই আসনে বসেই দীর্ঘদিন মা কালীর সাধনা করতেন গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী।

সন্ন্যাসীর মৃত্যুর পর থেকে সেই আসনে আর কেউ বসেননি। আজও মন্দিরে তাঁর সাধনার স্মৃতি বহন করে চলেছে এই পঞ্চমুণ্ডির আসন।

মূল মন্দিরের পিছনেই রয়েছে গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারীর সমাধি। মন্দির চত্বরে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিবমন্দিরও। ফলে শুধু মা কালীর আরাধনা নয়, গোটা মন্দির চত্বরেই ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সাধনপীঠের আবহ।

শিবের বুকে পদ্মফুল, তার উপরে আসীন দেবী! মূর্তিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। মা দুর্লভার বিগ্রহেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত কালীমূর্তির সঙ্গে এই বিগ্রহের বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। এখানে শিব শায়িত অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর উপরে রয়েছে একটি পদ্মফুল। সেই পদ্মের উপরেই আসীন দেবী। বর্তমানে দেবীর মূর্তিটি শ্বেতপাথরের তৈরি। তবে সবসময় এমন ছিল না। আগে দেবীর বিগ্রহ ছিল অষ্টধাতুর। তারও আগে বেলকাঠ দিয়ে তৈরি মূর্তিতে পুজো হত বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে বিগ্রহের পরিবর্তন হলেও মন্দিরের প্রাচীন পুজোর রীতি আজও বজায় রয়েছে।

শিয়ালকে কেন ভোগ দেওয়া হয়? আলু ভাতে, ঘি ভাতও পড়ে দেবীর পাতে!

দুর্লভা কালীবাড়ির সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য হল এখানকার ভোগের নিয়ম। প্রতিদিন নিয়ম করে শিয়ালকে ভোগ নিবেদন করা হয়। শুধু তাই নয়, সপ্তাহের প্রতিটি দিন অনুযায়ী দেবীর ভোগেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

সপ্তাহের কোন দিন কী ভোগ দেওয়া হয়?

সোমবার: দেবীকে নিবেদন করা হয় পায়েস।

মঙ্গলবার, শনিবার ও রবিবার: দেওয়া হয় খিচুড়ি ভোগ।

বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার: দেবীর ভোগে থাকে আলু ভাতে ও ঘি ভাত।

বিশেষ বিশেষ পুজোর সময় আবার দেবীর ভোগে নিবেদন করা হয় শোল মাছ পোড়া এবং কারণবারি। তন্ত্রমতে পুজো হওয়া এই মন্দিরে ভোগের এমন বৈচিত্র্য ভক্তদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।

আগে কার কাছে যায় দেবীর ভোগ? রয়েছে বিশেষ নিয়ম

এই মন্দিরে ভোগ নিবেদনের পদ্ধতিও বেশ আলাদা। প্রথমে ভোগ নিবেদন করা হয় সন্ন্যাসী গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারীর সমাধিতে। এরপর সেই ভোগ নিবেদন করা হয় পঞ্চমুণ্ডির আসনে। সবশেষে দেবী দুর্লভাকে নিবেদন করা হয় ভোগ।

অর্থাৎ, যাঁর সাধনার হাত ধরে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা, আজও তাঁর স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়েই শুরু হয় দেবীর ভোগ নিবেদনের পর্ব।

একদিকে অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখানোর অলৌকিক লোককথা, অন্যদিকে পঞ্চমুণ্ডির আসন, শিয়ালকে নিয়মিত ভোগ নিবেদন এবং দেবীর বিশেষ খাদ্যতালিকা—সব মিলিয়ে লাকুড্ডির দুর্লভা কালীবাড়ি যেন ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা ও লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। বর্ধমানের এই মন্দিরে পা রাখলে আজও যেন অনুভব করা যায় সেই প্রাচীন সাধনাস্থলের রহস্যময় আবহ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *