কলকাতা : রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দের পদধূলিধন্য মাটিতে এসে,  ‘বাগেশ্বর বাবা’, মানে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী হঠাৎ এসে বলে গেলেন, “দুর্গাপুজোর সময়ে যাঁরা আমিষ খান, তাঁরা ভণ্ড”। প্রত্য়াশিতভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, দুর্গাপুজোয় বাঙালি কী খাবে, তা ঠিক করে দেবেন মধ্য়প্রদেশের এক হিন্দিভাষী বাবা! আর এত বছর ধরে মন-প্রাণ দিয়ে দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠা বাঙালি, আজ তাঁর ফতোয়া না মানলে ভণ্ড! এ প্রসঙ্গে কী বললেন স্বামী পরমাত্মানন্দ মহারাজ। সনাতন ধর্ম সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন  পরমাত্মানন্দ মহারাজ। তিনি কী বললেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে। পুজোয় আমিষ খাওয়া কি উচিত নাকি অনুচিত ? 

পরমাত্মানন্দ মহারাজ  মধ্য়প্রদেশের এক হিন্দিভাষী বাবার কড়া সমালোচনা করলেন। স্পষ্ট বলে দিলেন, এ তার অল্প বয়সের প্রগলভতা, রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেয়ে বাচালতা ! তিনি বললেন, ‘যে তার বোনকে হিন্দু ধর্মে আটকে রাখতে পারে না, সে মুসলমানকে বিয়ে করে। যে তার নিজের ভাইকে নীতিশিক্ষা দিতে পারে না , নারী নির্যাতনের অভিযোগে যাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়। যে নিজেই  কৃষকদের জমি দখল করে সেখানে হনুমানজির মন্দির তৈরির পিলার গেঁথে ফেলে — তার কাছ থেকে আমরা শুনব, কে হিন্দু ধর্মে থাকবে আর কাকে হিন্দু ধর্ম থেকে বহিষ্কার করা হবে?’  

পরমাত্মানন্দ মহারাজ এর  পর্যবেক্ষণ,’ অল্প বয়সের প্রগলভতা কখনও কখনও ভালো। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাচালতাও হয়তো চলে … কিন্তু সেই বাচালতা যখন ধর্মের আড়ালে আসে, যখন ধর্মগুরুদের মাথায় চেপে বসে নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন সনাতন ভারতবর্ষ সেই প্রগলভতাকে কোনোদিনই মেনে নেবে না। বরং এই ধরনের আচরণকে অসভ্যতা ও বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই মনে করবে না।’  

‘বাগেশ্বর বাবা’-কে হনুবাবা বলে কটাক্ষ করে  পরমাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, আমিষ ভক্ষণ নিয়ে যে নিদান হনুবাবা দিচ্ছেন, সেই নিদান দেওয়ার নৈতিক বা ধর্মীয় যোগ্যতা তাঁর আদৌ আছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ তিনি গুলিয়ে ফেলছেন সারা ভারতবর্ষে প্রচলিত নবরাত্রির আচার আর বাংলায় প্রচলিত দুর্গোৎসবকে। বাংলার দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়। এর মধ্যে পৌরাণিক, বৈদিক, স্মার্ত, তান্ত্রিক, এমনকি অন্ত্যজ পরম্পরারও বহুস্তরীয় ছাপ রয়েছে।’

কীভাবে বাঙালির দুর্গোৎসবে মিশে গিয়েছে বিভিন্ন মতাদর্শ, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। ‘ নবমীর দিন এখনও কোথাও কোথাও বলিদানের পর নিম্নবর্ণের যে মানুষরা , যাঁরা ‘ছেত্তারা’ হিসেবে আসেন, তাঁদের মুখের ভাষা শুনলে অবাক হতে হয়। তাঁরা মাকে এমন অকপট, এমন অশ্রাব্য ভাষায় সম্বোধন করেন, যে ভাষা শুনলে কানে সেনসেশন এসে যাওয়ার মতো অবস্থা ! এই পরম্পরাকেই বলা হয় ‘শবরোৎসব’। এর উল্লেখ শাস্ত্রেও রয়েছে। তাহলে কি ‘শবরোৎসব’ও বাদ দিয়ে দিতে হবে? না। কারণ দুর্গাপূজা শুধু একটি পূজা নয়। দুর্গাপূজা একটি পরম্পরা। দুর্গাপূজা একটি জাতির ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য।’ 

‘বাগেশ্বর বাবা’-কে কটাক্ষ করে পরমাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, ‘  ঠিক তেমনই, দুর্গাকে কেন্দ্র করে একজন মানুষ তাঁর সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন। এর মধ্যে মিশে আছে সমস্ত বর্ণের ইতিহাস, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আচার, লোকসংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং তার দীর্ঘ বিবর্তনের কাহিনি। ‘    

‘দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের পিছনে নোংরা নোংরা খাবার তৈরি করা হয়।’ মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বরধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় পড়ে গেছে। প্রশ্ন উঠছে, যে বাঙালি যুগ যুগ ধরে নিয়ম-আচার মেনে দুর্গাপুজো করছে, তাকে খাবার নিয়ে পাঠ দেওয়ার মধ্য়প্রদেশের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী কে? 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *