ঝিলম করঞ্জাই, সন্দীপ সরকার ও পূর্ণেন্দু সিংহ, কলকাতা: রোগীর অস্তিত্ব নেই, কিন্তু তাঁর চিকিৎসা হয়েছে! নার্সিংহোমটাই নেই, অথচ সেখানে অপারেশন হয়েছে! আর ভুয়ো বিলে সই করেছেন ভুয়ো চিকিৎসক! স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বাসা বেঁধে ছিল এরকম অসংখ্য ভূত! প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো কার্ডে দুর্নীতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, সেই টাকা গিয়েছে, কালীঘাট থেকে তৃণমূলের অফিসে। পাল্টা জবাব দিয়েছে মমতা তৃণমূল কংগ্রেস।
ভুয়ো কার্ড… ভুয়ো উপভোক্তা। ভুয়ো রোগ… ভুয়ো ডাক্তার। ভুয়ো হাসপাতাল থেকে ভুয়ো TPA। একেবারে ভুয়োর ভূতুড়ে কাণ্ড! কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটে বললেও কম বলা হবে! লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে ইতিমধ্য়েই সামনে এসেছে ভুরি ভুরি অভিযোগ! তৃণমূল জমানার স্বাস্থ্য়সাথীতেও এবার ধরা পড়ল দুর্নীতির অসুখ! স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, স্বাস্থ্যসাথীতে মিলেছে প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো কার্ডের খোঁজ! তছরুপ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি! স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র, দুর্নীতির হিমশৈলের চূড়া মাত্র! ময়না তদন্তের মতো এর অর্থনৈতিক অডিট হচ্ছে, আমরা চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছি স্বাস্থ্যসাথীর যে পরিসংখ্যান আছে।’
স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, অন্তত ৩০ লক্ষ কার্ড দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তিকে, যাঁদের কোনও অস্তিত্ব নেই। যে রোগীর নামে বিল করা হয়েছে, সেই রোগী ভুয়ো, তিনি ভর্তিই হননি! যে রোগের কারণে রোগী ভর্তির দাবি করা হয়েছে, বিল করা হয়েছে অন্য রোগের! যে নার্সিংহোমের নামে বিল করা হয়েছে, সেই নার্সিংহোমের কোনও অস্তিত্বই নেই! ভুয়ো নার্সিংহোমের নামে তৈরি বিলে সই করেছেন ভুয়ো চিকিৎসক! স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, এইভাবে ভুয়ো বিল তৈরি করে আদায় হত বিমার টাকা।
কিন্তু, সেই টাকার ভাগ কোথায় কোথায় যেত? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চাঞ্চল্য়কর অভিযোগ, এই দুর্নীতির টাকা পৌঁছেছে কালীঘাটে বা তৃণমূলের অফিসে। শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘এই যে বলয়টা, দুর্নীতির বলয় এর মধ্যে কে কে ছিল? বা এমন কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিল কিনা যার নির্দেশে এটা করা হয়েছিল। তো এখান থেকে তো পয়সার প্রচুর আমদানি হয়েছে, তো এই পয়সাটা কোথায় যেত? পশ্চিমবঙ্গে এখনও অব্দি যতগুলো দুর্নীতি হয়েছে প্রত্যেকটাই তো আমি বলতে পারি যে, মুখ্যমন্ত্রীর নেক নজরে ছিল হয়তো। হয় এই মানি ট্রেল কালীঘাট বা হরিশ মুখার্জি অব্দি পৌঁছেছে বা তৃণমূলের কংগ্রেসের অফিস অব্দি পৌঁছেছে, কোথাও না কোথাও তো গেছে। কেন সবাই চুপ ছিল? আমরা যদি ৫ মাসে জানতে পারি, তা ১৫ বছরে কেন কেউ জানতে পারল না?’
কী করে সামনে এল এই দুর্নীতির ছবি? স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, কয়েক মাস আগে এই তথ্য প্রথম নজরে আসে বর্ধমানের আহাদ মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালের বিলের সূত্রে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকে দেখা যায় ১৪৪টি স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের সঙ্গে চিকিৎসার বিলের মিল নেই। হাসপাতালকে শোকজ করা হলেও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। এরপর, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথীর যে বিল জমা দিয়েছিল, তা পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে আরও গরমিল। দুই ২৪ পরগনার, হাওড়া, হুগলি বর্ধমান সহ বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংমকে শোকজ করা হয়। পাশাপাশি, শুরু হয় তদন্ত।
ইতিমধ্য়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে তৃণমূল জমানায় মহিলাদের জন্য় চালু হওয়া প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেয়েছে পুরুষরা! এবার স্বাস্থ্য়সাথী প্রকল্পেও উঠল তছরুপের অভিযোগ! ইতিমধ্যেই কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ২টি TPA-কে। অভিযুক্ত একাধিক বিমা কোম্পানিকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। চলছে ফিনান্সিয়াল ফরেন্সিক অডিট।