কমলকৃষ্ণ দে, পূর্ব বর্ধমান: এককালে বাংলার মানুষের কাছে দামোদর (Damodar River) পরিচিত ছিল ‘দুঃখের নদ’ নামে। পরবর্তীতে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি) গঠিত হওয়ার পর সেই আখ্যা অনেকটা ঘুচেছে ঠিকই, কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের (Purba Bardhaman) জামালপুর ও রায়না এলাকার অন্তত ১৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে দামোদর আজও দুঃখের কারণ হয়েই রয়ে গিয়েছে। কারণ একটাই একটি পাকা সেতুর অভাব।

দামোদর পারাপার করতে আজও তাদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগ, বর্ষায় এলেই আরও বাড়ে দুর্ভোগ। জল বেড়ে গেলে মাঝেমাঝেই বন্ধ করে দেওয়া হয় খেয়া পাড়াপাড়। খেয়া পাড়াপাড়ও চলে লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই। যদিও এ বিষয়ে খেয়া পাড়াপাড়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঠিকাদার সংস্থার কর্মী জানান লাইফ জ্যাকেট থাকলেও আরোহীরা তাড়াহুড়োতে তা পড়েন না। 

দামোদর নদের একপাড়ে রয়েছে বর্ধমান ২ ব্লকের শক্তিগড়ের বড়শুল, আর ঠিক উল্টো পাড়ে জামালপুরের শম্ভুপুর, চক্ষণজাদি ও রায়নার বিস্তীর্ণ এলাকা। মাঝে পাকা সেতু না থাকায় ভরা বর্ষায়ও জামালপুর ও রায়নার শম্ভুপুর, চক্ষণজাদি-সহ বহু গ্রামের মানুষের ভরসা খেয়া পারাপার। আবার নদে জলের স্রোত অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সুরক্ষার স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই খেয়া পারাপারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্ষা শেষে জল কমলে দামোদরের বুকে আবারও তৈরি করা হয় নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই দুর্বল সাঁকো দিয়ে পারাপারের সময় প্রতিনিয়ত একটা ভয় কাজ করে, আর বর্ষায় খেয়া পার হতে হয় রীতিমতো প্রাণ হাতে নিয়ে। 

আরও পড়ুন:- অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে ভবিষ্যদ্বাণী, তৃণমূলের বর্তমান পরিণতি দেখে কী বলছেন গৌতম দেব? 

জামালপুরের শম্ভুপুর খেয়াঘাট দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে নিত্যযাত্রী ও রোগী সবার কাছেই শক্তিগড়, মেমারি কিংবা কলকাতা পৌঁছানোর এটিই সবচেয়ে কম দূরত্বের পথ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাকা সেতু না থাকায় তাঁদের প্রতিদিন এই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অথচ বিকল্প পথে যেতে গেলে বিপত্তির শেষ নেই। দামোদরের এক প্রান্তে থাকা কৃষক সেতু পেরিয়ে শক্তিগড় পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১৮ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। আবার অন্য প্রান্তে জামালপুরের হরেকৃষ্ণ কোঙার সেতু ঘুরে শক্তিগড় বা বড়শুল আসতে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। তাই তিনটি ব্লকের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম করতে এই এলাকায় দ্রুত একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।  

স্থানীয় বাসিন্দা বিক্রমাদিত্য রক্তান বলেন, ‘বর্ষা এলেই দামোদরের বাঁশের সাঁকো জলের তোড়ে ভেসে যায়। ফলে দুই পারের বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছাড়াও বহু স্কুলপড়ুয়া ঝুঁকি নিয়ে এই নদী পারাপার করে। তাছাড়া জল বাড়লে ঘাটের জায়গা ঘন ঘন বদলাতে হয়, নৌকার নিয়মিত যাতায়াতও বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে রাত ন’টার পর আর কোনো নৌকার দেখা মেলে না। ফলে রাতে কোনো মুমূর্ষু রোগীকে বড়শুল বা বর্ধমানের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলে চরম বিপদে পড়তে হয়।’

আরও পড়ুন:- নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে মনোনয়ন তুলে নিতে চাপ দিয়েছিল পুলিশ! চাঞ্চল্যকর অভিযোগ 

স্কুলপড়ুয়া অয়নিকা মিত্রকে বলতে শোনা যায়, ‘রায়নার সুদর্শনপুরে বাড়ি হলেও নৌকার ঝক্কি আর সময় নষ্ট এড়াতে বরশুলেই থেকে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছি। বর্ষায় নৌকা বন্ধ থাকলে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হয় স্কুলের জন্য। বর্ষায় প্রাণ হাতে নিয়ে নৌকা পারাপার আর বছরের অন্য সময়ে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। দ্রুতগতির বাইক চললে সেই দুর্বল সাঁকো কেঁপে ওঠে। বইয়ের পাতায় পড়েছি দামোদরকে দুঃখের নদ বলে ডিভিসি হওয়ার পর দামোদরের বন্যা কমেছে, কিন্তু আমাদের এই সাঁকো আর নৌকার দুর্ভোগ আমাদের ভুলতে দেয়নি দামোদর দুঃখের নদ।’

এই কারণেই দ্রুত একটি পাকা সেতুর দাবি জানাচ্ছে আট থেকে আশি সকলেই। এ বিষয়ে জামালপুরের বিডিও পার্থ সারথি দে জানান, ‘খুব তাড়াতাড়ি ব্রীজ তৈরীর জন্য পরিদর্শন হবে এবং ব্রীজ তৈরীর প্রস্তুতি নেওয়া হবে।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *